
প্রতিনিধি: নিউজ ডেস্ক রিপোর্ট
এলাকা: চট্টগ্রাম ব্যুরো:
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিবহন বিভাগের শিপিং শাখায় কর্মরত উচ্চমান সহকারী মো. আরিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি, ফাইল আটকে রাখা, ক্ষমতার অপব্যবহারসহ নানা অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একই শাখায় একই পদে টানা প্রায় আট বছর ধরে দায়িত্ব পালন করায় তার প্রভাব ও দীর্ঘদিন একই স্থানে বহাল থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক শিপিং এজেন্টের অভিযোগ, বিভিন্ন আবেদন ও নথিপত্র প্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে আরিফ মাহমুদ সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে অর্থ দাবি করেন। অর্থ দিতে রাজি না হলে ফাইল দীর্ঘদিন আটকে রাখার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও করেছেন কেউ কেউ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিপিং এজেন্টের কর্মকর্তা বলেন, “টাকা না দিলে ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে বাড়তি টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেন।”
‘কালু শাহ এন্টারপ্রাইজ’ নিয়ে প্রশ্ন
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মো. আরিফ মাহমুদ তৎকালীন চট্টগ্রাম-১১ আসনের সংসদ সদস্য এমএ লতিফের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সময়ে তৎকালীন সিবিএ সাধারণ সম্পাদক নায়েবুল ইসলাম ফটিকের আশীর্বাদে তার ভাইয়ের নামে ‘কালু শাহ এন্টারপ্রাইজ’ নামে একটি ভেন্ডর লাইসেন্স অনুমোদন করানোর অভিযোগও রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, ওই ভেন্ডরের মাধ্যমে কাজ করা শিপিং এজেন্টদের ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি করা হতো। অন্যদিকে, যারা ওই ভেন্ডরের মাধ্যমে কাজ করতেন না, তাদের ফাইল দীর্ঘ সময় আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. আরিফ মাহমুদ বলেন, “এটি আমার না, আমার ভাইয়েরও না।”
তবে প্রতিবেদকের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স তার আপন ভাইয়ের নামে রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
সরকারি কোয়ার্টার ভাড়া দেওয়ার অভিযোগ
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বরাদ্দকৃত আগ্রাবাদের ডেবার পাড় এলাকার জে-১১৬/বি নম্বর সরকারি বাসা নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বরাদ্দ পাওয়া বাসাটি অন্যের কাছে ভাড়া দিয়েছেন আরিফ মাহমুদ। অথচ ওই বাসায় সরকারি বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ বিভিন্ন সুবিধা ব্যবহৃত হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজে ছোটপুল এলাকায় একটি নিজস্ব ফ্ল্যাটে বসবাস করেন।
বাসা ভাড়া দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে আরিফ মাহমুদ বলেন, “বন্দরে অনেকে বাসা ভাড়া দিয়েছে। শুধু কি আমারটা দেখলেন?”
তবে সরকারি কোয়ার্টারটি তিনি অন্যকে ভাড়া দিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো জবাব দেননি।
মোটরসাইকেল ব্যবহারেও প্রশ্ন
বন্দর কর্তৃপক্ষের বরাদ্দকৃত মোটরসাইকেল নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। কয়েকজন সহকর্মীর দাবি, তারা আরিফ মাহমুদকে নিয়মিত মোটরসাইকেল চালাতে দেখেননি। অথচ জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ নিয়মিত অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে আরিফ মাহমুদ বলেন, “আমি নিজেই চালাই, তবে প্রায় সময়ই এটি নষ্ট থাকে।” পরে তিনি জানান, মোটরসাইকেলটি নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মোটরসাইকেলটির জ্বালানি ও মেরামত বাবদ নিয়মিত অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে। বিষয়টি যাচাইয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট হিসাব ও নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
ঘুষ চাওয়ার অডিও রেকর্ড
এক ভুক্তভোগীর সঙ্গে অর্থ চাওয়ার বিষয়ে আরিফ মাহমুদের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে।
অডিওটির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে বলেন, “এ বিষয়ে কিছু করতে পারলে করেন।” এরপর ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
লাইসেন্স নবায়নের সময় ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এটি আমার দপ্তরে রিনিউ হয় না।”
আট বছর একই শাখায়, বদলি না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন
২০১৮ সাল থেকে একই শাখায় একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন মো. আরিফ মাহমুদ। দীর্ঘ সময় একই শাখায় অবস্থানের ফলে তার প্রভাব ও প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টদের অনেকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন সময়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি হলেও আরিফ মাহমুদ একই শাখায় বহাল রয়েছেন। সম্প্রতি বন্দর কর্তৃপক্ষ পুরোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি সংক্রান্ত আদেশ জারি করলেও তাতে তার নাম না থাকায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এ বিষয়ে আরিফ মাহমুদ বলেন, “আমি এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করছি। বন্দর কর্তৃপক্ষ আমাকে সরাচ্ছে না।”
সরকার বদলের পর নতুন পরিচয়ের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, ৫ আগস্টের পর আরিফ মাহমুদ নিজেকে বিএনপির নির্যাতিত নেতা হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। বর্তমানে সাধারণ কর্মচারীদের বদলির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্রশাসনের বক্তব্য
মোটরসাইকেল সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রশাসন বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি ট্রাফিক সেকশনের আওতাধীন। এ বিষয়ে ট্রাফিক সেকশনের পরিচালকের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে মো. আরিফ মাহমুদ ঘুষ, সরকারি বাসা ভাড়া ও মোটরসাইকেল সংক্রান্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ‘কালু শাহ এন্টারপ্রাইজ’ তার কিংবা তার ভাইয়ের নয় বলেও দাবি করেছেন তিনি।
তবে তার বক্তব্যের বিপরীতে পাওয়া তথ্য, সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ এবং অডিও রেকর্ডের বিষয়গুলো যাচাই করা হচ্ছে। বিশেষ করে একই শাখায় দীর্ঘদিন ধরে একই পদে থাকা, সরকারি কোয়ার্টার ব্যবহার, মোটরসাইকেলের জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ অর্থ উত্তোলন এবং ভেন্ডর লাইসেন্সের বিষয়গুলো বন্দর কর্তৃপক্ষের নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযোজন করা হবে।
অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।